পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা
বলা হইয়া থাকে পৃথিবীতে তৃতীয় মহাযুদ্ধ বাঁধিবে পানি সম্পদের হিস্যা লইয়া। সেইরূপ ঘটিবার আশু সম্ভাবনা না থাকিলেও বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরিয়াই বলিতেছেন, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস লইয়া দ্বন্দ্ব-সংঘাতের স্থান দখল করিবে খাবার পানির সমস্যা। যেমন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, তেমনই শিল্পক্ষেত্রেও পানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়িতেছে; কিন্তু মজুত বাড়িতেছে না, ক্রমশই কমিতেছে। প্রাকৃতিক এই সম্পদে ঐশ্বর্যবান নদীমাতৃক বাংলাদেশেও সঙ্কট ঘনীভূত হইয়াছে দিনকে দিন। উক্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে পানি সম্পদের সুব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দেশে এই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হইয়াছে। প্রস্তাবিত আইনে পানি সম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, আহরণ, বিতরণ, ব্যবহার, সুরক্ষা ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিবে। স্থাপনা নির্মাণ বা জলাধার ভরাট করিয়া পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করিলে জেল-জরিমানার বিধানও রাখা হইয়াছে। কারণ, সীমিত সম্পদ বিবেচনা করিয়া সকলের প্রয়োজন মিটাইতে পানি আহরণ, উন্নয়ন ও ব্যবহারে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং আইন ও নীতিনির্ধারণ জরুরি।
বর্তমানে দেশে জলভাগের আয়তন হইতেছে ৩,৬৬১ বর্গমাইল। একসময় দেশে সহস াধিক নদী থকিলেও এখন তাহার সংখ্যা ২শ' ৫৪টিতে ঠেকিয়াছে, নাব্যতার অভাবে সেগুলিরও অধিকাংশ আজ মৃতপ্রায়। এক সময়কার চিরচেনা নদীগুলি শুকাইয়া মরুভূমি হইতেছে। খাল-বিল কমিয়া আসিয়াছে, হাওর-বাঁওড়েও নেই আগের সেই থৈ থৈ অবস্থা। মাছে-ভাতে বাঙালির পাতে এখন আর মাছ জোটে না, নদীনির্ভর জেলে সম্প্রদায় বেকার হইতেছে, ব্যবসাবাণিজ্য হরাস পাইয়াছে। পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করিয়াছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। ইহার নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করিতেছে বাংলাদেশ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ হরাস পাইতেছে, কিন্তু বাড়িয়া চলিয়াছে লবণাক্ততা, সুপেয় পানির অভাব, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙ্গন ও ভূমিধসের ঘটনা। সেচ ও অন্যান্য প্রয়োজনে গভীর নলকূপ দিয়া পানি আহরণের ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নামিয়া যাইতেছে। তদুপরি, জনসংখ্যার চাপ আর বাণিজ্যিক স্বার্থে পুকুর-ডোবা, বিল-ঝিল হইতে হাওড়-বাঁওড় পর্যন্ত ভরাট হইতেছে। এমনকি জলজ্যান্ত নদীও দখল প্রক্রিয়ার বাহিরে নাই।
প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম জলাধার এবং প্রবাহগুলির নাব্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পানি ধারণক্ষম করিয়া তুলিবার মধ্যেই রহিয়াছে পানি সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সমাধানের উপায়। প্রস্তাবিত আইন নিঃসন্দেহে সঙ্কট উত্তরণে সহায়তা করিবে। সত্তরের দশকে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে হাজিয়া-মজিয়া যাওয়া অনেক ছোট নদী ও খালের পুনর্জীবন দান সম্ভবপর হইয়াছিল। অনেক ক্ষেত্রে ভাঙ্গন রোধ করিতে পারা গিয়াছিল। কিন্তু, সেই কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নাই। আশার কথা হইল, সম্প্রতি দেশি-বিদেশি অর্থায়নে সরকার ভূউপরিস্থ পানির উত্স বৃদ্ধির মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিতে গিয়া প্রাথমিকভাবে ৫০টি জেলার প্রতিটি উপজেলায় চারটি করিয়া প্রায় এক হাজার ৫০০ খাল খননের উদ্যোগ লইয়াছে। আমরা বলিব, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, কর্মসৃজন প্রকল্প ইত্যাদি খাতের সাহায্য-সহযোগিতা কর্মসূচি ব্যবহার করিয়া খাল খনন কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা যাইতে পারে। হাজিয়া-মজিয়া যাওয়া খাল, ছোট ছোট শাখা ও উপনদী খনন করা হইলে সারাদেশে স্বাদু পানির চাহিদা যেমন দূরীভূত হইবে এবং মত্সসম্পদ বৃদ্ধি পাইবে, তেমনই বর্ষা মৌসুমে উপনদী ও খালের মাধ্যমে জনপদের বৃষ্টির পানি আসিয়া বৃহত্ নদীসমূহে পড়িয়া নাব্যতা সংকটও দূর করিবে। ব্যক্তিগত জলাভূমি সংস্কার এবং দূষণ রোধে জনসচেতনতাও গড়িয়া তুলিতে হইবে।