বিশিষ্ট কাহিনীকার, চলচ্চিত্র সাংবাদিক, গীতিকার আহমদ জামান চৌধুরী খোকা আর নেই। গতকাল বিকেল তিনটায় ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহে রাজিউন)। গত শুক্রবার এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। সোমবার অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। গুণী এই ব্যক্তির চিরবিদায়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে বইছে শোক। আজ বেলা ১২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আহমদ জামান চৌধুরীর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর এফডিসিতে নিয়ে যাওয়া হবে। শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন তিনি। পাঁচ শতাধিক গানও লিখেছেন তিনি চলচ্চিত্রের জন্য। তার এই প্রয়াণে 'প্রসঙ্গ বয়ান'-স্মৃতিচারণ করেছেন তারই কাছের ব্যক্তিরা।
গ্রন্থনা করেছেন রবি হাসান
আমি এক কথায় বলতে পারি তার মতো ভালো মানুষ আমাদের চলচ্চিত্রে শিল্পে নেই, ছিলও না। তিনি দুর্ঘটনার স্বীকার হওয়ার পর থেকেই আমিসহ আরও কয়েকজন নিয়মিতই তাকে দেখতে যাচ্ছি, খোঁজ-খবর নিচ্ছি। এমনকি তার চিকিত্সার প্রয়োজনে যা কিছু করা দরকার তারও উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তাকে আরও উন্নত হাসপাতালে নেওয়ার জন্যও বলেছিলাম, কিন্তু তার চিকিত্সারত ডাক্তাররা বললেন, তাকে এই মুহূর্তে কোথাও ট্রান্সফার করা ঠিক হবে না। এমন আছে যে রাস্তায়ই দূর্ঘটনাটি ঘটতে পারে। গতকাল সন্ধ্যায়ও তাকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম সেই সকাল থেকেই। কিন্তু দুপুর ৩টায় যখন সংবাদ আসে খোকা ভাই আর নেই, তখনই মনে হলো যেন হঠাত্ আকাশ থেকে পড়লাম। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।
ববিতা, চিত্রনায়িকা
এটা অনেক পুরোনো কথা যে কেউ মারা গেলেই আমরা অনেকেই বলে থাকি তার শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তার বেলায় তো এই কথাটাও হার মেনে যায়। এর চেয়ে বড় কোনো কথা থাকলে তাও বোধহয় সমপরিমাণ হতো না। তার শূন্যস্থান যে আসলেই পূরণ হওয়ার নয় এই কথাটা আমি কীভাবে আরও শক্ত করে প্রকাশ করব। সেই ১৯৭২ সাল থেকে তার সাথে আমার সম্পর্ক। আমি মনে করি এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তারা সবাই একমত পোষণ করবেন যে, তার মতো ট্যালেন্ট, গুণী লোক আর একজনও নেই। সাংবাদিক ছিলেন, ক্রিটিক ছিলেন আরও কত গুণ তার। সবচেয়ে বড় গুণ অতিরিক্ত মানের ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। সবার উপকার করে বেড়াতেন, আদেশ হোক, উপদেশ হোক, যেভাবেই পারতেন উপকার করতেন। সর্বশেষ তার সঙ্গে আমার দেখা হয় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি 'দেবদাস'-এর প্রিমিয়ারে। সেদিন তিনি আমাকে বললেন, 'আমি ২৫ বছর ধরে কোনো রিভিউ লিখছি না, চাষী ভাই আপনার 'দেবদাস' নিয়ে রিভিউ লিখতে চাই।' আমি বললাম, 'প্লিজ'। সেদিনই তার সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়। রাজ্জাকের যে নায়করাজ টাইটেলটি আছে এটি কিন্তু তারই দেওয়া। সোহেল রানাকে অ্যাকশন হিরো টাইটেল তারই দেওয়া। কিন্তু দুঃখের কথা হলো আমরা তার জীবদ্দশায় কোনো সম্মান দিতে পারিনি। এটা আমাদের স্বভাব, গুণী ব্যক্তিদের আমরা মর্যাদা দিই না। আমি ব্যক্তিগতভাবেও তার এই বিয়োগে খুব বেশি কষ্ট পেয়েছি। তিনি তো বিয়ে করেননি, তাই বাড়িঘরও সেইভাবে করেননি। আসলে তিনি একাই ছিলেন, আর একাই চলে গেলেন। যখন সিনেমার বেহাল অবস্থান, তিনি নিজেকেও গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আর বারবার বলতেন কী হবে এই ইন্ডাস্ট্রির। তার প্রতি শ্রদ্ধা রইল।
চাষী নজরুল ইসলাম, চলচ্চিত্র পরিচালক
খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। এত ভালো মানুষ ছিলেন যে, কোনোদিন কখনও কারও ক্ষতি করেছেন কিংবা নেগেটিভ কিছু করেছেন এমনটা মিডিয়ার কেউ শুনেনি। আমাদের চলচ্চিত্রে তার অবদান এক কথায় অকল্পনীয়। চলচ্চিত্র শিল্পকে তিনি তার লেখা দিয়ে চেষ্টা করেছেন সর্বশীর্ষে তুলে ধরার। তার এই শূন্যস্থান আসলেই পূরণ করার মতো কেউ নেই। তার মৃত্যুটা আরও বেশি কষ্টকর, দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন, ঠিকমতো ট্রিটমেন্টও হয়নি তার। এগুলো মেনে নেওয়া যায় না। খুবই কষ্টকর। এত মিষ্টি মানুষ ছিলেন তিনি যা বলার বাহিরে। তিনি চলে গেছেন কিন্তু তার যে স্মৃতি, তার কলমের যে জোর তিনি দেখিয়েছেন তা কখনও ইতিহাস থেকেও মুছবে না, আমদের মন থেকে তো কখনোই না। সাংবাদিক অঙ্গনে তার অবদান চিরদিন থেকে যাবে।
চম্পা, চিত্রনায়িকা
বাংলাদেশের সিনেমা জগত্ একটা অসম্ভব প্রতিভাকে হারালো, এটা অকল্পনীয়। সিনেমা হয়তো সবাই দেখে, করে। কিন্তু সিনেমা বুঝার লোক বাংলাদেশে কম আছে। আমরা অনেকেই সিনেমা না বুঝে তৈরি করেছি, করছি। কিন্তু তিনি থিওরিক্যাল, প্র্যাকটিক্যাল সব দিক থেকেই অনেক ভালো বুঝতেন সিনেমা সম্পর্কে। ১৯৭৬ সালে আমার ওস্তাদ মাসুদ পারভেজের এর একটি ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলাম। তখন ওই ছবির স্ক্রিপ্টের জন্য প্রায় নিয়মিতই খোকা ভাইয়ের বাসায় যাতায়াত হতো। এইতো, মাত্র দশ-বারোদিন আগে তার সঙ্গে দেখা। দীর্ঘক্ষণ ধরে কথা বললাম। সেদিন তাকে বললাম, ভাই পরিচালক সমিতির সভাপতি হলাম, খোকা ভাই আপনার সহযোগিতা লাগবে। তিনি বললেন সব সময় তোমাদের পাশে আছি। যতদূর সম্ভব করব।
শহীদুল ইসলাম খোকন, চলচ্চিত্র পরিচালক
ও পরিচালক সমিতির সভাপতি