ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ ২০১৩, ২৩ ফাল্পুন ১৪১৯, ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৪
সর্বশেষ সংবাদ সংকট মোকাবেলায় আলোচনার বিকল্প নেই: সৈয়দ আশরাফ | চাঁপাইনবাবগঞ্জে যুবলীগ কর্মী নিহত | শনিবার ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে | ইটালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বার্লুসকোনির এক বছরের জেল | ছাড়া পেলেন বিএনপির চার নারী এমপি | হরতালে বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ
নারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে
আফতাব চৌধুরী
মহিলাদের উপর ক্রমবর্ধমান অত্যাচার বিশেষ করে ধর্ষণের মতো সংঘটিত অপরাধ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এহেন অপরাধের বিরুদ্ধে লাগাম ধরতে নানাজনের নানা মত প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। অপরাধীদের দমনে সরকারও কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তাতে কি আসে যায়, আমাদের সামাজিক বাতাবরণ এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, এখানে যত আইন- কানুন, শাস্তি বিধান তৈরি হচ্ছে অপরাধীর সংখ্যাও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যথারীতি নানাভাবে আশ্রয় পেয়ে অপরাধীরা পারও পেয়ে যাচ্ছে। এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ যাদের উপর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সামগ্রিকভাবে এ সমাজে নারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। কিন্তু পুরুষ জাতির প্রায় সমসংখ্যক এদেশের নারী জাতির প্রকৃত আত্মমর্যাদাবোধ আজও সেরকম জাগ্রত হয়নি। আজ তাদের উপর নির্যাতন-আক্রমণ ক্রমাগত বেড়ে চলার প্রশ্নে সামাজিক পরিবেশ যেমন দায়ী, ঠিক তেমনি নিজেদের আত্মসম্মানবোধের অভাবকেও অস্বীকার করা যায় না। আজকাল একাংশ মেয়েদের তো পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও শালীনতার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর দ্বারা যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি হচ্ছে তা মোটেই নয়, বরং এক ধরনের বিকৃত আবেদন জাগিয়ে তোলাটাই যেন তাদের লক্ষ্য। আর এর মাধ্যমে নিজের রুচি-সংস্কৃতির মানেরও প্রতিফলন ঘটছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই মা-বাবাদের একটি কর্তব্য রয়েছে। আর সেটা হলো ছেলেমেয়েদের রুচিকর সংস্কৃতির মান ধরিয়ে দেয়া, যদিও স্বাবলম্বী হওয়ার পর কে কী করবে তা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার হওয়া উচিত; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে একেবারে বেপরোয়া হয়ে যাওয়াটাই ব্যক্তি স্বাধীনতা। এর দ্বারা অন্যের কাছে হেয় হওয়ার চাইতেও বেশি ক্ষতিকর দিক হলো, নিজের আত্মচেতনার অবক্ষয়। আর এসবের ফায়দা নেয় সুযোগসন্ধানীরা। অথচ সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজেই মহিলারা যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন এর মধ্যে কোনো ঘটনাকেই সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ থেকে আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। নারী-পুরুষকে সম্মিলিতভাবে এ সামাজিক অব্যবস্থার প্রতিকার করতে হবে, বিশেষ করে মহিলাদের আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে এ সংগ্রামে বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতিটি স্তরেই সমাজ পরিবর্তনে মহিলাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। অথচ সর্বস্তরেই ছিল মহিলাদের উপর অকথ্য নির্যাতন ও দমন-পীড়ন। বিশেষ করে মধ্যযুগে অন্যায়-ব্যভিচারে মহিলাদের সামাজিক অবস্থান শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মধ্যে ছিল। শিল্প বিপ্লব বা নবজাগরণের বিকাশ, বিশেষ করে ফরাসী বিপ্লবের সূচনা, নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাবনা-ধারণা সমাজের মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসে। সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, ধর্মীয় শাসনের কবল থেকে সমাজকে মুক্ত করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে মহিলাদের ভূমিকা ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করছে। কারণ বিকাশশীল বা প্রগতিশীল আন্দোলনে মহিলাদের এগিয়ে গিয়ে অংশগ্রহণ শুধু সমাজের বা নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনেই নয়, নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনেও লড়াই করতে হয়েছে। এ প্রয়োজন আজও শেষ হয়ে যায়নি। গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা, সাম্য-মৈত্রীর বাণী নিয়ে সমাজে নবচেতনা, নবজাগরণের উন্মেষ ঘটে। সমস্ত বাধা-বিঘ্নের গণ্ডি অতিক্রম করে মহিলাদের সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে কার্যকর ভূমিকা নিতে হয়েছে। এ মহত্ কাজে উত্সাহ ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন বিভিন্ন প্রধান রাজনৈতিক নেতা ও সমাজ সংস্কারক । তারা নারী জাতিকে মর্যাদার ভিত্তিতে উঠে দাঁড়াতে উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন।

নবজাগরণ ও শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এক বিরাট পরিবর্তন হলো। সামন্ততান্ত্রিক ও ধর্মীয় অনুশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা দেশে দেশে আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন হতে শুরু হলো। আর এ পরিবর্তনে প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা করেন প্রতিটি দেশের পুঁজিপতি শিল্পপতিরা। কারণ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুঁজিবাদী অর্থনীতি কায়েম করা মোটেই সম্ভব নয়। সেজন্য নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন। তাই জ্ঞান- বিজ্ঞানের জয়গান গেয়ে ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন ভাবধারা, আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে মানুষকে প্রচলিত সে ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে আনা চাই এবং এর প্রয়োজনীয়তা তো ছিলই। কিন্তু পুঁজিপতি, শিল্পপতিদের সেই অন্য মতলবকে আর প্রতিহত করা যায়নি। সমাজ পরিবর্তন হলেও নতুন করে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠল। সাম্য-মৈত্রীর সে সমাজ প্রতিষ্ঠার বিরোধী হয়ে দাঁড়ালো পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও তার বিষময় সংস্কৃতি আজ বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী রূপ ধারণ করে নিয়েছে। তার সে প্রগতিশীল চরিত্র হারিয়ে চরম প্রতিক্রিয়াশীল রূপ নিয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ঘর, পরিবার , সমাজের দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করে চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক-আত্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। রুচি-উন্নত সংস্কৃতির গলা টিপে অপসংস্কৃতির জোয়ার বয়ে দিচ্ছে সমস্ত প্রচার মাধ্যমের মধ্য দিয়ে। প্রতিটি পণ্যের মতো মহিলাদের পর্যন্ত বাজারের একটি পণ্যে পরিণত করে দিয়েছে। এর বিষময় প্রতিক্রিয়া সমাজে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলছে। নির্মম অর্থনৈতিক শোষণের ফলে ক্রমবর্ধমান বেকার, এমনকি শিক্ষিত বেকার পর্যন্ত হতাশ হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে দেয়া মদ, ড্রাগস ও জুয়ার আড্ডায়। আধুনিকতার নামে মেয়েদের প্রতি আধুনিক বেপরোয়া মানসিকতা গড়ে উঠছে। রুচি-সংস্কৃতি ভালো-মন্দের তোয়াক্কা না করা অতি আধুনিক মেয়েদের এটা যে শধু বিপর্যস্ত করছে তা নয়, সমাজবোধেরও সমূহ ক্ষতি করছে এবং শেষ পর্যন্ত রাস্তার মদমত্তদের শিকারে পরিণত হতে হচ্ছে। কিন্তু এরা কারা, কিভাবে এদের সৃষ্টি করা হচ্ছে? পুঁজিবাদ অপসংস্কৃতির যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে তার বিষম প্রতিক্রিয়া গোটা সমাজে তো পড়বেই, প্রতিটি ঘর আক্রান্ত হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়, আজ না হয় কাল হবেই। কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন-'মানুষকে অমানুষ না বানালে পশুর কাজ আদায় করা যায় না' আজকের পুঁজিবাদ ঠিক তাই করছে, অন্যথায় তার অর্থনৈতিক শোষণ-জুলুম টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কারণ মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াবেই।

এ অবস্থার মধ্যে পুরুষ ও নারীদের যথেষ্ট সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে নারী সচেতনতা এখন অত্যন্ত আবশ্যক। সুস্থ সমাজ গঠনে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তারা যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছেন। সেজন্যই সামাজিক পরিবর্তন ঘটাতে তাদের এ ভূমিকাকে বাস্তবে কাজে লাগাতে হবে। পরিবারের সন্তান-সন্ততিকে যদি তারা উপযুক্ত নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারেন তবে পরবর্তী স্তরে সে প্রজন্মই সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে এসে সমাজের অর্ধাংশের প্রতি সংঘটিত অন্যায় ও বঞ্চনা দূরীকরণে সচেষ্ট হবে। সেজন্যই নারী সমাজকে এক সংগঠিত দৃঢ় শক্তিরূপে আজ বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।

লেখক:সাংবাদিক
( লেখাটি পড়া হয়েছে ৭৮ বার )
সর্বাধিক পঠিত
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিবাদের জন্য হরতালের বিকল্প খুঁজতে হবে। তার এই বক্তব্য আপনি যৌক্তিক বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
মতামত দিনফলাফল
আজকের নামাজের সময়সূচী
মে - ২৩
ফজর৩:৪৭
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৪০
এশা৮:০২
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
বছর : মাস :
সম্পাদক: আনোয়ার হোসেন। উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে আনোয়ার হোসেন কর্তৃক ৪০, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ থেকে প্রকাশিত ও মুহিবুল আহসান কর্তৃক নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস, কাজলারপাড়, ডেমরা রোড, ঢাকা-১২৩২ থেকে মুদ্রিত। কাওরান বাজার ফোন: পিএবিএক্স: ৭১২২৬৬০, ৮১৮৯৯৬০, বার্ত ফ্যাক্স: ৮১৮৯০১৭-৮, মফস্বল ফ্যাক্স : ৮১৮৯৩৮৪, বিজ্ঞাপন-ফোন: ৮১৮৯৯৭১, ৭১২২৬৬৪ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭২, সার্কুলেশন ফ্যাক্স: ৮১৮৯৯৭৩। e-mail: ittefaq@bangla.net
Copyright The Daily Ittefaq © 2013 Developed By : orangebd.com.