[ রা জ নী তি ]
এই আক্রমণ কেন?
কাজী মাহবুবুর রহমান
ছোটবেলায় সুকুমার সেনের খুব ভক্ত ছিলাম। সব শিশুদের মনের কথা সুকুমার বাবু যেন জানতেন। শিশুদের মাথায় যত প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তার সবই যেন সুকুমার সেনের মাথায় ঘুরপাক খায়। সে সময়ে খুব কৌতূহলের সাথে তাঁর একটি ছড়া প্রায়ই আবৃত্তি করতাম। ছড়াটি হলো 'বিষম চিন্তা'। ছেলেবেলায় মাথায় যে কত আজব প্রশ্ন জাগে এবং সে প্রশ্নগুলোর উত্তর যে কেউ দিতে পারে না— সে বিষয়েই ছড়াটি। ছড়াটি এভাবে শুরু হয়— 'মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার—/সবাই বলে— মিথ্যে বাজে বকিসনে আর খবরদার! / অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব? / বলবে সবাই মুখ্যু ছেলে, বলবে আমায় গো গর্দভ!' দিনের বেলায় কেন ঘুম পায় না, বর্ষার সময় ব্যাঙের গলায় এতো জোর কেন, গাধার শিং এবং হাতির পালক নেই কেন—এমন অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে ছড়াটি। কিন্তু ছড়াটি পড়ে মন খারাপ হয়ে যেত যখন শেষ লাইনটি পড়তাম। 'বয়স হলে কেতাব খুলে জানতে পাব সবই'। বাড়ির সব মুরুব্বীদের প্রশ্ন করলেও বলতো বড় হলে সব জানতে পারব। সুকুমার সেন আমাদের প্রশ্নগুলো বুঝতেন কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উত্তর দিতেন বাড়ির সব অন্য মুরুব্বীদের মতোই। বাংলাদেশে রাজনৈতিক কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা একশ্রেণীর সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে বর্ষার ব্যাঙের গলার জোরের মতো সব জোর তাদের কব্জিতে ধরা দেয়। বর্ষায় ব্যাঙ গলা ফাটিয়ে মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। কিন্তু কতিপয় সন্ত্রাসী ঘুম হারাম করে প্রতিবেশী অতি আপনজন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর। লুটপাট করে তাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। অনেক সময় রক্তের খেলায় মেতে ওঠে। হত্যা করে তাদের পুরুষদের আর অপমানিত করে নারীদের। কিন্তু 'বিষম চিন্তা'র মতো 'গো গর্দভ' বা 'মুখ্যু ছেলে' থেকে যাই যখন সন্ত্রাসীদের এই তাণ্ডবের পেছনের শক্তির খোঁজ পাই না। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার আছে এবং তার আছে শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু নিরাপত্তা নেই সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের। কক্সবাজারের রামু মন্দির পোড়ার ঘা না শুকাতেই শুরু হয়েছে আরেক তাণ্ডব। দেশের প্রায় সব ক'টি জেলায় হিন্দু-বৌদ্ধ সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর ও উপাসনালয়গুলো আক্রান্ত হয়েছে। হতাহতেরও সংবাদ খবরের কাগজে এসেছে। এই আক্রমণকে নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে। রাজনীতির মূল খেলোয়াড়গণ একে অপরকে দোষ দিচ্ছেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছেন না সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর ও উপাসনালয়গুলোকে রক্ষায়। সবাই রাজনৈতিক কাদা ছুঁড়াছুঁড়িতে ব্যস্ত। অথচ গত দিনও চট্টগ্রামে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে উপাসনালয়গুলো। তাই 'বিষম চিন্তা' সরকার ও বিরোধী দলের কাজ কি এই কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি নাকি এই তাণ্ডব রুখে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা?
সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ইতিহাসে একটি নতুন বিষয় নয়। সেই প্রাচীন যুগে আলেকজান্দ্রিয়ায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল ইহুদি ও গ্রীকদের মধ্যে। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও সামপ্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন সময়। এশিয়া, আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই এই প্রপঞ্চটি বেশি মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট সংঘটিত 'ভয়াবহ কলকাতা দাঙ্গা' আমাদেরকে এখনো আতঙ্কিত করে। এই দাঙ্গার জন্য ভারতের হিন্দু-মুসলিম নেতৃত্বকেও দায়ী করা হয়। যদিও ঔপনিবেশিক শাসকদের 'ভাগ কর, শাসন কর নীতি' ও এই দাঙ্গার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসনামলে আর একটি ভয়াবহ দাঙ্গা হয় ১৯৬৪ সালে। এই দাঙ্গার সূত্রপাত কাশ্মীরে হলেও এটি ভয়াবহ রূপ লাভ করে পূর্ব পাকিস্তানে। অনেকের বিশ্বাস, পূর্ব পাকিস্তানে এ দাঙ্গার পেছনে আইয়ুব সরকার ও তার স্থানীয় প্রতিনিধি মোনায়েম খানের সক্রিয় ইন্ধন ছিল। ব্রিটিশ-ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় কাজী নজরুল ইসলামের হূদয় কেঁপে উঠেছিল। তিনি কবিতায় লিখেছিলেন, "মাভৈ:! মাভৈ:, এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতের প্রাণ,/সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান, গোরস্থান।" ঔপনিবেশিক শাসনামলে কখনো কখনো ব্রিটিশ শাসকদের উস্কানিতে, কখনো বা হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দের উগ্রতায়, কখনো কতিপয় সুবিধাবাদী লোকের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে এবং গোরস্থান ও শ্মশান সজীব হয়েছে। পাকিস্তান শাসনামলে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাকে উস্কে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ চলছে তা কোনো দাঙ্গা নয়। এটি সংখ্যালঘুদের উপর রাজনৈতিক কারণে কতিপয় সন্ত্রাসীর আক্রমণ। এটি সন্ত্রাস। একতরফা আক্রমণ। নিরস্ত্র সংখ্যালঘু নারী-পুরুষের উপর এবং তাদের উপাসনালয়গুলোর উপর কতিপয় সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব। এই বর্বরতা রুখতেই হবে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বা পাকিস্তানি শাসনামলে হিন্দু-মুসলিম উভয় সমপ্রদায় একে অপরের উপর আক্রমণ করেছে। কিন্তু ২০১৩ সালে হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর কতিপয় সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালাচ্ছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে এদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবন ও সম্পদের অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। এক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় ভুলে যেতে হবে। সকল ধর্মের লোকেরাই বাংলাদেশের নাগরিক। এই নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো নয়। তাছাড়া গণতন্ত্রায়ণের একটি মৌলিক দিক হলো সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায়ন। বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার বা বিরোধী দলগুলোর কোনো হঠকারি সিদ্ধান্তই যেন আমাদের গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করতে না পারে সে বিষয়ে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের করের টাকাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেছনে খরচ হয়। তাই রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব সকল নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কতিপয় সন্ত্রাসী আমাদের গণতন্ত্রের যাত্রাকে ব্যাহত করবে তা হতে পারে না। আমরা যে কোনো মূল্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা রক্ষা করব—এ অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতেই হবে এবং প্রকৃত অপরাধীকে পাকড়াও করে ন্যায় বিচারের অধীন করতে হবে।
মালয়েশিয়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের 'ভাগ কর, শাসন কর নীতি' সেখানেও কার্যকর ছিল। ফলে সেখানকার অধিবাসী মালয়ি, চাইনিজ ও ভারতীয়দের মধ্যে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা লেগেই থাকতো। ১৯৬৯ সালের সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় মালয়েশিয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মালয়েশিয়ার সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সে দাঙ্গা থেকে শিক্ষা নেয়। তারা বুঝতে পারে সমপ্রদায়গুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই তারা শিক্ষানীতি ও অর্থনৈতিক বণ্টন নীতির মধ্যে নানা পরিবর্তন আনয়ন করে। যার ফলে আন্তঃসম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অসন্তোষ হরাস পায় এবং মালয়েশিয়া এগিয়ে যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে সংখ্যালঘুদের উপর যে আক্রমণ চলছে তা বণ্টন নীতির ত্রুটির জন্য নয়। এটি আমাদের মানসিক সমস্যা। আমাদের কেউ নির্বাচনে বিজয়ী না হতে পারলে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ করে। কেউবা রাজনৈতিকভাবে বিপদগ্রস্ত হলে সংখ্যালঘুদের উপর হামলে পড়ে। অন্যদিকে, কেউ স্রেফ রাজনৈতিক লাভালাভির জন্য সংখ্যালঘুদের ইস্যু বানায়। কিন্তু এ সব কিছুতে যেটা পরিষ্কার সেটা হলো সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত। আমরা কোনোভাবেই এই অবস্থা অব্যাহত থাকুক তা চাই না। আমরা স্থিতিশীল বাংলাদেশ চাই। আমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি চাই। ধর্মের বিচারে কেউ কারোর উপর আক্রমণ করুক তা চাই না। আমরা বিশ্বাস করি, 'সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই'।
লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Email: kazipoliticalscience@gmail.com