ইতিহাস
৭ মার্চের ভাষণেই মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিল
নাসিরউদ্দিন সিকদার
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সাল। ছাত্র-জনতা, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, বাংলার উত্তাল জনতা রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত। রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় ভরে গেল। রেসকোর্স ময়দানকে মনে হল উত্তাল সমুদ্রের মত। সবার হাতে লাঠি-সোটা, রড ইত্যাদি। নেতার মুখে স্বাধীনতার বাণী শুনবার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সমবেত এ জনসমুদ্র। সমস্ত দেশবাসী রেডিও নিয়ে বসে আছে। বাঙালির মুক্তির দিশারী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের মুখে স্বাধীনতার বাণী শুনবার অপেক্ষায়। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন। সমস্ত রেসকোর্স ময়দান আনন্দে গর্জে উঠল। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালী অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর। তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। আর না অধীনতা এবার চাই স্বাধীনতা। বাঙালির জাতির পিতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধু ২৩ বছরের বাঙালির বঞ্চনার ইতিহাস বললেন। ২৩ বছর বাঙালির রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হবার ইতিহাস বললেন। ১৯৫৪ সালে নির্বাচিত হয়েও বাঙালিরা ক্ষমতায় যেতে পারেনি পশ্চিমাদের ছোবলের জন্য সে ইতিহাস বললেন। বঙ্গবন্ধু বললেন- রক্ত যখন দিয়াছি রক্ত আরো দেবো, এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। মুক্তিবাহিনী গঠন কর। আমি যদি আর কোন নির্দেশ দিতে নাও পারি তোমরা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাবে। ওদের সমস্ত পথ বন্ধ করে দিবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সমস্ত দিক নির্দেশনা দিলেন। কোন নির্দেশই বাকি রাখলেন না। সার্বক্ষণিক সমস্ত জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন। রেসকোর্স ময়দানে মুহুর্মুহু গর্জনের মত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা পেয়ে সমগ্র জাতি মুক্তিবাহিনী গঠন করল। শেখ মুজিবের অনুগামী লাখ লাখ যুবক কিশোর, প্রৌঢ়, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এমনকি বাংলার সমস্ত নারী সমাজ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিল। সবাই ট্রেনিং নিতে শুরু করল। রাজারবাগের পুলিশ পিলখানার ইপিআর সদা প্রস্তুত থাকল। বাংলাদেশের প্রত্যেক গ্রামে, ইউনিয়নে, থানায়, মহকুমায়, জিলায়, বিভাগে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং শুরু হল। সর্বত্র সংগ্রাম কমিটি গঠন করল। দেশে সর্বকালের স্মরণীয় জাগরণের সৃষ্টি হল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমস্ত বাংলাদেশ চলল। পাকিস্তান সরকারের কোন নির্দেশ বাংলাদেশে চলে না। ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে তার ৩২ নম্বরের বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন। এটাও স্বাধীনতা ঘোষণা। ২৫ মার্চ রাত ১২টায় পাকিস্তানী বাহিনী বাঙালিদের উপর সমগ্র আক্রমণ করল। সাথে সাথেই রাজারবাগ পুলিশ পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করল। পিলখানার ইপিআর বিভিন্ন থানা থেকে প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হল। রাজারবাগ থেকে পুলিশ মরণপণ যুদ্ধ শুরু করল। একপর্যায়ে পাকিস্তানী বাহিনী পর্যুদস্ত হলে তারা আবার নতুন করে রণ সজ্জিত হয়ে রাজারবাগ আক্রমণ করল। রাজারবাগ পুলিশ অব্যাহত প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে গেল। প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। রাজারবাগ পুলিশই হল প্রথম মুক্তিযোদ্ধা। রাজারবাগ পুলিশই হল প্রথম শহীদ। ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর অর্থাত্ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয় তার কয়েকঘন্টা পূর্বেই। অর্থাত্ ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার পর বাঙালি জাতি আর কোন নির্দেশনার অপেক্ষায় ছিল না। ৭ মার্চের ভাষণই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত নির্দেশনা ছিল। চূড়ান্ত প্রেরণা ছিল।
লেখক: সাবেক ব্যাংকার ও ছাত্রনেতা