দেখার যেন কেউ নেই
শেখ মুহাম্মদ এনামুল হক
দেশের বেশকিছু সরকারি ব্যাংকের সাধারণ মানুষের জামানত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি চলছে অথচ দেখার যেন কেউ নেই। এত টাকার আত্মসাত্ এ যেন সর্বকালের পুকুর চুরিকে ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে যে সমস্ত ব্যাংকের টাকা এভাবে কথিত ব্যবসায়ী নামের অব্যবসায়ী গ্রুপ অব কোম্পানির নাম ভাঙ্গিয়ে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে লুটপাটের মতো বস্তাভরে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তা শুনলে অবাক হতে হয়। আমার প্রশ্ন হলো একজন সত্ ব্যবসায়ী যেমন ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় আকারের সে যেই হোক না কেন, সে যখন ব্যাংকে তার পরিকল্পিত ঋণ বা লোনের প্রস্তাব নিয়ে কোন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনায় বসে, সহজে তাকে পাত্তা দেয়া হয় না। ব্যাংক লোন পেতে হলে প্রায় ব্যাংকের বড় সাহেবরা সত্যিকার ব্যবসায়ীদের গুরুত্ব কম দিয়ে থাকে। ছোট এবং মাঝারি আকারের ব্যবসায়ীরা কিন্তু এ ধরনের হলমার্ক মার্কা গ্রুপ অব কোম্পানি, বিসমিল্লা মার্কা গ্রুপ অব কোম্পানির মতো কখনও সাগর চুরির মতো চিন্তা করে না। এখানে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি যেসব ব্যাংক থেকে এ সমস্ত নামধারী গ্রুপ অব কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা ভুয়া ব্যবসার কাগজপত্র এবং ভুয়া এলসির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়ে ব্যাংককে ফতুর বানিয়ে দিচ্ছে তা যেন যথাযথ কর্তৃপক্ষের তেমন বোধগম্য হচ্ছে না। মাঝে- মধ্যে শুধু কেবল দুদক নামের সংস্থাটি এসব ব্যাংক কেলেঙ্কারির রুই-কাতলমার্কা ছদ্মবেশী বড় ব্যবসায়ী নামধারীদের চরমপত্রের মাধ্যমে হুঁশিয়ারি নোটিস করছেন। আমি মনে করি দুদকের মতো যদি দেশের প্রত্যেক কর্তাব্যক্তি যেমন অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর, এনএসআই, ডিবি, এসবি সকল ধরনের আইন-শৃংখলা বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি এ সমস্ত অসত্ দুরভিসন্ধিমূলক বড় বড় দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের সঠিক তথ্যের মাধ্যমে একটু আইনের বাঁকা চোখের নজরে আনলে মনে হয় অল্প সময়ে দুর্নীতিবাজ থেকে এ দেশের মানুষ অনেকটা রেহাই পেত।
আমরা যারা ৭১-এর বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধা তাদের মধ্যে কিন্তু রিক্সাচালক, দিনমজুর থেকে শুরু করে অনেক মন্ত্রী বাহাদুর পর্যন্ত রয়েছেন। একজন সাধারণ সৈনিক থেকে মেজর জেনারেল পর্যন্ত রয়েছেন তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আশা করি এ দেশের কোন সেক্টরে এ ধরনের সাগর চুরির মতো ভুয়া ব্যবসা, দুর্নীতির ব্যবসা কোন মুক্তিযোদ্ধা ভাই করে না এবং করবে না।
আমি বারবার বলব, আপনারা এ স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি সোনার বাংলা গড়ার মন-মানসিকতা সৃষ্টি করুন। আরও দুঃখ হয়, আজ দেশে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার বহাল থাকা অবস্থায় কি করে এভাবে দিনদুপুরে এ দেশের অনেক অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙ্গিয়ে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরা হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। অবশ্যই এটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক এবং ব্যর্থতা বলে মনে করতে হবে। এ দেশে লতা-পাতা চুরির বিচার হয় খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে; কিন্তু এত বড় বড় পুকুর চুরি/সাগর চুরির বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক হত, যা এদেশের সর্বস্তরের মানুষ দেখতে পারত, তবেই সরকার সফল হত। বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং দুদক কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান বাস্তবায়ন করুন। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যথাযথ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করলেই এসব কেলেঙ্কারি রহিত হবে।
কিছুদিন আগে আমাদের দেশের জনপ্রিয় নেতা এদেশের মহান সংসদের স্পিকার এ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেছেন, এ দেশের দুর্নীতির পরিমাণ যদি কিছুটা কমানো যেত তবে এ দেশে কয়েকটা পদ্মা সেতু করা যেত। একটা দেশের সংসদের মাননীয় স্পিকার অতি দুঃখের সঙ্গে মনের ব্যথা প্রকাশ করেছেন যেভাবে, তা যদি এদেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের বোধগম্য হয় তবেই দেশের অনেক পবির্বতন হতে পারে। আমি বারবার বলব, প্রতিবার লিখব, একটি সফল দেশ, উন্নয়নশীল দেশ এবং মধ্যম আয়ের দেশ হতে ৪২ বত্সর সময় অবশ্যই লাগে না। আজ যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন স্ব স্ব স্থানে আপনারা সকলেই পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন থাকুন এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করুন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি সরকারের কাছে তাই আশা করি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা